এক:
কামরস (মযী) নাপাক জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে পবিত্রতা অর্জন করা আবশ্যক।
ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“কামরস পরিচিত ও স্বাভাবিক বস্তু। ... কামরস বের হলে ওযু করা ওয়াজিব এবং নাপাক হওয়ার কারণে তা ধৌত করাও ওয়াজিব¾ এ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। এটি ইজমা।”[আত-তামহীদ (২১/২০৭)]
অতএব, যদি কামরস বের হয়ে শরীরে লাগে, তাহলে যে স্থানে লেগেছে তা ধুয়ে ফেলা আবশ্যক। যে ব্যক্তি জানে যে তার শরীরে কামরস লেগেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তা না ধুয়ে নামাজ পড়ে, তার নামাজ শুদ্ধ হবে না।
শরীর বা কাপড় পবিত্র না থাকা অবস্থায় নামাজের হুকুম সম্পর্কে (12720) ও (103846) নম্বর প্রশ্নের উত্তর দেখুন।
দুই:
যদি কামরস অণ্ডকোষে লাগে তবে তা ধুয়ে নাপাক দূর করা আবশ্যক, যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু যদি কামরস অণ্ডকোষে না লাগে এবং নির্গমনের স্থান অতিক্রম না করে, তবে এ অবস্থার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে: শুধু নির্গমনস্থল ধোয়াই যথেষ্ট হবে, নাকি সম্পূর্ণ লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধোয়া ওয়াজিব হবে?
ইমাম আহমদের মত হলো: লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ উভয়টি ধোয়া ওয়াজিব।
আল-মারদাওয়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“নাপাক হওয়ার মতের ভিত্তিতে: মাযহাবের সঠিক অভিমত হলো, কামরস বের হলে লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ উভয়ই ধৌত করতে হবে।”[আল-ইনসাফ (২/৩২৮–৩২৯)]
এর দলিল হলো: সহীহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লিঙ্গ ধোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যার বাহ্যিক অর্থ হলো পুরো লিঙ্গ ধোয়া। আর বুখারী-মুসলিম ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে (যেমন মুসনাদ আহমদ) অণ্ডকোষ ধোয়ার নির্দেশ এসেছে।
আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “আমি এমন ব্যক্তি ছিলাম যার বেশি পরিমাণে কামরস বের হত। তাই আমি এক ব্যক্তিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিজ্ঞেস করতে পাঠালাম, তাঁর কন্যার মর্যাদার কারণে (নিজে লজ্জাবশতঃ জিজ্ঞাসা করিনি)। সে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: ‘ওযু করো এবং তোমার লিঙ্গ ধুয়ে নাও।’”[হাদীসটি বুখারী (২৬৯) ও মুসলিম (৩০৩) বর্ণনা করেন]
এই পাঠের প্রত্যক্ষ অর্থ হলো: পুরো লিঙ্গ ধোয়া। তবে অধিকাংশ আলেম বলেছেন: এখানে ‘লিঙ্গ’ দ্বারা উদ্দেশ্য কামরস নির্গমনের স্থানটুকু; পুরো লিঙ্গ নয়। তারা এটাকে অন্য সব নাপাকির ওপর কিয়াস করেছেন। কারণ অন্য সব নাপাকির ক্ষেত্রে শুধু নাপাক লাগার স্থানটুকু ধোয়া আবশ্যক হয়।
ইবনু দাকীকিল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“তারা (ফকীহরা) মতভেদ করেছেন: পুরো লিঙ্গ ধোয়া হবে; নাকি শুধু নাপাকির স্থান ধোয়া হবে? অধিকাংশ আলেমের মত হলো, শুধু নাপাকির স্থান ধোয়া যথেষ্ট।”[ইহকামুল আহকাম (১/৭৪)]
নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“ওয়াজিব হলো শুধু নাপাকির স্থান ধোয়া; এটাই আমাদের মাযহাব এবং অধিকাংশ আলেমের মত।”[আল-মাজমূ‘ (২/১৪৪)]
ইবনে রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“কামরসের কারণে লিঙ্গ ধোয়ার নির্দেশের মর্ম নিয়ে আলেমদের মতভেদ হয়েছে: এতে কি শুধু যেটুকুতে কামরস লেগেছে সেটুকু ধোয়া বোঝানো হয়েছে; নাকি পুরো লিঙ্গ ধোয়া বোঝানো হয়েছে? এ বিষয়ে দুইটি মত আছে এবং দু’টোই মালেক ও আহমদ থেকে বর্ণিত মত।”[ফাতহুল বারী (১/৩০৪)]
ইবনে দাকীকিল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“অধিকাংশ আলেম ‘লিঙ্গ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ তথা ‘সমগ্র লিঙ্গ’ গ্রহণ না করে অন্য অর্থ গ্রহণ করেছেন হেতুর দিকে দৃষ্টি দিয়ে। কারণ ধোয়াকে আবশ্যককারী হলো: কামরসের নির্গমন। এই হেতুর দাবী হলো শুধু নির্গমনস্থলেই ধোয়া সীমাবদ্ধ থাকা।”[ইহকামুল আহকাম (১/৭৪)]
আবূ জা‘ফর আত-তাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“যুক্তির দিক থেকে বিষয়টি হলো: আমরা দেখলাম ‘কামরস নির্গমন’ একটি অপবিত্রতা (হাদাস)। তখন আমরা অন্যান্য অপবিত্রতার দিকে লক্ষ্য করলাম, এতে করে কী ওয়াজিব হয়? পায়খানা বের হলে শুধু শরীরের যেখানে লেগেছে তা ধোয়া ওয়াজিব হয়, এর বেশি নয়। তবে নামাযের জন্য পবিত্রতা অর্জন ব্যতিক্রম (সেক্ষেত্রে আরো কিছু ধুইতে হয়)। তেমনি রক্ত বের হলেও (যারা এটিকে অপবিত্রতা বলেন) একই বিধান।
সুতরাং এর বিধানও অন্যগুলোর মত হওয়াটা যুক্তিযুক্ত। কামরস বের হওয়া অপবিত্রতা (হাদাস), এতে করে শুধু শরীরের যেখানে তা লেগেছে সেটুকু ধোয়া ওয়াজিব হবে। তবে নামাযের জন্য পবিত্রতা অর্জনের বিষয়টি ভিন্ন। এটিই আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মদ ইবনুল হাসান রাহিমাহুমুল্লাহুর মত।”[শারহু মা‘আনিল আছার (১/৪৮)]
নাপাকি বলার প্রবক্তারা এ যুক্তির জবাবে বলেন: নির্গমনস্থলের চেয়ে বেশি স্থান ধোয়া আবশ্যক হওয়া অসম্ভব নয়। শরীয়তে এর নজির আছে। যেমন বীর্য বের হলে পুরো শরীর ধোয়া ফরজ হয়। তারা বলেন: লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধোয়ার উপকারিতা হলো: এতে বীর্যের নির্গমন স্থগিত হয়ে যায়।
ইবনে তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“এটি উত্তেজনার সাথে বের হয়। তাই এর কারণে নির্গমনস্থলের চেয়ে বেশি স্থান ধোয়া আবশ্যক হতে পারে, যেমনটি বীর্যের ক্ষেত্রে। কারণ অণ্ডকোষ হলো এর পাত্র। সেগুলো ধুইলে নির্গমন স্থগিত হয়ে যায় এবং এর প্রভাব দূর হয়ে যায়।”[শরহুল উমদাহ (১/১০৩)]
ইমাম আহমদ মুসনাদে (২/২৯৩) এবং আবূ দাউদ (২০৮) হিশাম ইবনে উরওয়া থেকে বর্ণনা করেন, তিনি উরওয়া থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “আলী ইবনু আবী তালিব মিকদাদকে বললেন। ... মিকদাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: ‘সে যেন তার লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধুয়ে নেয়।’”
হাফেয ইবনে হাজার আত-তালখীসুল হাবীর (১/১১৭)-এ বলেন:
“আবূ দাউদ উরওয়ার সূত্রে আলী থেকে বর্ণনা করেছেন: ‘সে তার অণ্ডকোষ ও লিঙ্গ ধুয়ে নেয়’। যদিও উরওয়া আলী থেকে হাদিস শোনেননি, তবে আবূ আওয়ানা তার সহীহ গ্রন্থে উবাইদা থেকে আলী হয়ে এই অতিরিক্ত অংশসহ বর্ণনা করেছেন এবং উক্ত সনদের ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই।”
সান‘আনী সুবুলুস সালাম (১/১৯৯)-এ বলেন:“এই বর্ণনা সহীহ হওয়ার পর এটি গ্রহণ না করার ক্ষেত্রে কোনো ওজর নেই।”
আবূ দাউদ (২১১) বর্ণনা করেন: আলা ইবনুল হারিস থেকে, তিনি হারাম ইবনে হাকীম থেকে, তিনি তার চাচা আব্দুল্লাহ ইবনে সা‘দ আল-আনসারী থেকে, তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন জিনিস গোসল ফরজ করে এবং পানির পরে যে পানি বের হয় তা সম্পর্কে। তিনি বললেন: ‘ওটা কামরস। প্রত্যেক পুরুষেরই কামরস বের হয়। তুমি তোমার লজ্জাস্থান ও অণ্ডকোষ ধুয়ে নেবে এবং নামাজের জন্য ওযু করবে।’” এ হাদীসকে শাইখ আলবানী সহীহ সুনান আবি দাউদ (১/৩৮১)-এ সহীহ বলেছেন।
শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন:“কামরসের ক্ষেত্রে ওয়াজিব হলো লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধোয়া।”[ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে বায (১৭/৫৮)]
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির আলেমরা বলেন:
“ ... কামরস নাপাক। অতএব যদি কামরস বের হয়, তবে লিঙ্গের গোড়া থেকে ধুয়ে ফেলবে এবং অণ্ডকোষ ধুয়ে ফেলবে। আর কাপড় ও শরীরে যা লেগেছে তাতে পানি ছিটাবে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলীকে কামরসের কারণে লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধোয়া এবং ওযু করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কাপড়ে যা লেগেছে তাতে পানি ছিটাতে বলেছেন।”
আল্লাহই তাওফীকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও সাহাবীদের প্রতি দরূদ ও সালাম।
ইলমী গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি
আবদুল্লাহ ইবনু কু‘ঊদ … আবদুল্লাহ ইবনে গুদাইয়ান … আব্দুর রাযযাক আফিফী … আবদুল আযীয বিন আবদুল্লাহ বিন বায”[ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ (৫/৩৮২)]
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: কামরস বের হলে লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধোয়ার ব্যাপারে কোন মতটি অধিক শক্তিশালী?
তিনি উত্তর দেন: ‘অধিক শক্তিশালী মত হলো ওয়াজিব হওয়া। এতে একটি চিকিৎসাগত উপকারও আছে। তা হলো: লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধুইলে কামরস বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।’[শাইখ ইবনু উসাইমীনের ‘আল-কাফী’ গ্রন্থের টীকা]
সুতরাং সহীহ হাদীস থাকার কারণে কামরস বের হলে লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধোয়া ওয়াজিব। এই মতই অধিক শক্তিশালী।
আর নামায সঠিক হওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের ইজতিহাদি বিষয়ে কোনো ব্যক্তি দুই মতের কোনো একটি মতকে সঠিক মনে করে তা অনুসরণ করলে অথবা কোনো ইমামের তাকলীদ করলে তার জন্য কোনো গুনাহ নেই।
(166106) ও (49752) নং প্রশ্নের উত্তরও দেখুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।