ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিগুলোতে যারা অর্থ হারিয়েছে তাদের জন্য দশটি উপদেশ

প্রশ্ন 34808

ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিগুলোতে যারা অর্থ হারিয়েছে তাদেরকে আপনি কী উপদেশ দিবেন?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

১- মুসলমানের উচিত তার অর্থ হালাল ও বৈধ খাতে বিনিয়োগ করা; হারাম খাতে নয় এবং সংশয়পূর্ণ খাতগুলো থেকে বিরত থাকা।

২- অর্থ পরিচালনা, বৃদ্ধি ও বিনিয়োগে শক্তিশালী ও আমানতদার এবং বিনিয়োগের নানা পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নির্বাচন করা।

৩- মুদারাবা (অংশীদারি বিনিয়োগ) ও বিনিয়োগের চুক্তি শরিয়তসম্মত হতে হবে, বাতিল ও হারাম শর্ত থেকে মুক্ত হতে হবে। তাই এমন কোনো চুক্তিতে প্রবেশ করা যাবে না যাতে মূলধনের গ্যারান্টি দেওয়া হয় কিংবা নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। বরং আবশ্যক হলো উভয় অংশীদারের লাভের শতকরা হার জানা থাকা।

৪- বিনিয়োগ পরিচালনাকারী অংশীদারের উচিত মানুষের অর্থ পরিচালনায় আল্লাহকে ভয় করা। সে যেন এ পরিমাণ অর্থ গ্রহণ না করে যা পরিচালনা করার সক্ষমতা তার নেই এবং এমন কারো কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ না করে যার অর্থ সে ঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে না বলে সে নিজে জানে। তাকে মুদারাবার শর্তবলি মেনে চলতে হবে। যদি মূলধনদাতা শর্ত করে যে নির্দিষ্ট দেশে বিনিয়োগ করতে হবে, তবে তা অমান্য করা যাবে না। যদি নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগের শর্ত দেয় তবে তা অতিক্রম করা তার জন্য জায়েয হবে না। মানুষের সাথে প্রতারণা করে প্রকৃতপক্ষে লাভ না হলেও লাভ হচ্ছে বলে ভান করা যাবে না। পুরোনো বিনিয়োগকারীদের লাভ নতুনদের মূলধন থেকে দেওয়া কবীরাহ গুনাহ হবে, যখন প্রকৃতপক্ষে তার এমন কোনো ব্যবসা নেই যাতে অর্থ বাড়ে। মানুষকে উচ্চ মুনাফার লোভ দেখানোও জায়েয নয়, যখন সে নিশ্চিতভাবে জানে যে তার কাছে এমন কোনো ব্যবসা নেই যা এতটা লাভ দিতে পারবে।

৫- তাকে মানুষের অর্থের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে হবে এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজে দক্ষ এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিতে হবে, যারা মানুষের কাছ থেকে গৃহীত এই অর্থগুলো বৃদ্ধি করতে সক্ষম।

ক্ষতি হলে করণীয়:

  • মানুষের কাছে সততা ও আমানতদারিতার সঙ্গে বাস্তব অবস্থা জানানো বিনিয়োগ পরিচালনাকারীর উপর আবশ্যক।
  • যদি তার পক্ষ থেকে অবহেলা বা সীমালঙ্ঘন হয়ে থাকে তবে সে এর ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে এবং নিজের অবহেলার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তা নিজেকেই বহন করতে হবে।
  • মূলধনদাতার উচিত ক্ষতির ক্ষেত্রে আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, বিপদের তীব্রতা ও প্রভাব হ্রাস করার চেষ্টা করা এবং যতটুকু সম্ভব মূলধন উদ্ধার করার জন্য সকল বৈধ ও শরীয়তসম্মত উপায়ে চেষ্টা করা।
  • তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি আর্থিকভাবে লোকসান পড়া মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ও হতাশা থেকে রক্ষা করে। ফলে সে পাগল হয়ে যায় না, হার্ট অ্যাটাক করে না, আত্মহত্যা না করে; যেমনটি ধৈর্যহীন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।

লোকসানে পড়া ব্যক্তির নিম্নোক্ত বাস্তবতাগুলো স্মরণ করা উচিত:

মানুষের নিজের শরীর, সম্পদ, পরিবার বা সমাজের উপর যে বিপদাপদ আসে সেটা সর্বৈব অকল্যাণ নয় যে এর জন্য ভেঙে পড়তে হবে। বরং সে যদি মুসিবতকে সঠিকভাবে গ্রহণ করে ও যথাযথ করণীয় করে তাহলে সেটা মুমিনের জন্য কল্যাণকর। কারণ:

ক) সেটা তার জন্য কল্যাণকর। যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার সব পরিস্থিতিই কল্যাণকর; এটি কেবল মুমিনের জন্যই। সে সুখকর কিছু পেলে কৃতজ্ঞ হয়, তখন সেটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর কোনো দুঃখজনক কিছুতে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধরে, তখন সেটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।”[হাদীসটি মুসলিম (২৯৯৯)]

খ) হতে পারে এর মাধ্যমে আল্লাহ তার কল্যাণ চান। বুখারী (৫৬৪৫) বর্ণনা করেন: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ যার জন্য কল্যাণ চান তাকে দুঃখে-কষ্টে ফেলেন।”

হাফেয ইবনে হাজার বলেন: আবু উবাইদ আল-হারাওয়ী বলেছেন: অর্থাৎ আল্লাহ তাকে বিপদাপদের মাধ্যমে পরীক্ষায় ফেলেন যাতে করে এর জন্য তিনি তাকে প্রতিদান দিতে পারেন।

গ) সম্ভবত আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। “যখন আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন তখন তাদেরকে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় পড়ে যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে তার জন্য রয়েছে ধৈর্যের প্রতিদান; আর যে ব্যক্তি অধৈর্য হয় তার জন্য রয়েছে অধৈর্যতার ফল।” হাদীসটির বর্ণনাকারীরা নির্ভরযোগ্য।

সাখবারা রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “যাকে কিছু দেয়া হলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, বিপদে পড়লে ধৈর্য ধরে, যুলুম করে ফেললে ক্ষমা চেয়ে নেয় এবং জুলুমের শিকার হলে ক্ষমা করে দেয় তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত।”[ত্বাবরানী হাসান সনদে বর্ণনা করেন][হাফেযের কথা সমাপ্ত]

ঘ) আল্লাহ তাঁর কিতাবে এমন পদ্ধতি বলেছেন যা হৃদয়কে শান্ত করে, মনের ক্ষোভ প্রশমিত করে। তা হলো ধৈর্য ধরা ও ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলা। এর সাথে আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া এবং ধৈর্যশীল ও সওয়াব প্রত্যাশীর জন্য এমন নেকী দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন যা দিয়ে তিনি তার মর্যাদা উন্নীত করবেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওয়াদা; যা তিনি অচিরেই বাস্তবায়ন করবেন। আল্লাহ বলেন:

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ * أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

“আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পড়লে বলে: নিশ্চয় আমরা আল্লাহর মালিকানাধীন এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাদের ওপর রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে করুণারাশি ও অনুগ্রহ। আর এরাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।”[সূরা বাকারা: ১৫৫–১৫৭]

কুরতুবী বলেন: আল্লাহ তাআলা ‘ইসতিরজা’ এর শব্দগুলোকে তথা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলাকে বিপদগ্রস্ত ও পরীক্ষার শিকার ব্যক্তির জন্য শয়তান থেকে আশ্রয়স্থল ও সুরক্ষা বানিয়েছেন; যাতে করে শয়তান বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির উপর ভর করে তাকে মন্দ চিন্তার কুমন্ত্রণা দিতে না পারে। যার মাধ্যমে শয়তান স্থির জিনিসকে অস্থির করে তুলবে এবং গোপন বিষয়কে প্রকাশ্যে নিয়ে আসবে। কারণ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি যখন কল্যাণ ও বরকতের পূর্ণ ভাব অন্তর্ভুক্তকারী এ শব্দাবলীর মাধ্যমে আশ্রয় চায় তখন সে ‘ইন্না লিল্লাহ’ (আমরা আল্লাহর) বলার মাধ্যমে আল্লাহর দাস হওয়া ও মালিকানাধীন হওয়ার স্বীকারোক্তি দেয় এবং মুসিবতটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘটার স্বীকৃতি দেয়। মালিক তাঁর মালিকানাভুক্ত বস্তুতে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। আর ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (নিশ্চয় আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব) এর মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হয় যে, আল্লাহই আমাদেরকে ধ্বংস করবেন, তারপর পুনরুত্থিত করবেন। তাই সূচনাতে হুকুম তাঁর, শেষেও তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন। এই কথার মাঝে আখিরাতে প্রতিদান লাভের আশাও নিহিত আছে।

উল্লিখিত বিষয়াবলি ছাড়াও এই দোয়ার অন্যতম বরকত হলো দুনিয়ায় উত্তম প্রতিদান।

উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে মুসলমান বিপদে পড়ে বলে: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, হে আল্লাহ! আমাকে এই বিপদে প্রতিদান দিন এবং এর বদলে উত্তম কিছু দিন’ আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দেন।”

ঙ) বিপদাপদ গুনাহের কাফফারা (প্রতিকার)। কারণ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুসলমানের উপর যে কোনো বিপদ আসুক নাকেন এমনকি যদি তা কাঁটার খোঁচাও হয়, আল্লাহ এর দ্বারা তার গুনাহ মাফ করে দেন।”[বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেন]

চ) খারাপ খবর শোনার প্রথম ক্ষণেই ধৈর্যধারণ করা ও নিজেকে সংবরণ করা কাম্য। উদাহরণস্বরূপ বিনিয়োগ কোম্পানি ধসে পড়ার খবর পাওয়ার মুহূর্তেই। এই ধৈর্যধারণ ব্যক্তিকে স্ট্রোক করা, হার্ট অ্যাটাক করা কিংবা মানসিকভাবে ও স্নায়ুবিকভাবে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করবে। অধিকন্তু, যে ধৈর্যের কারণে বান্দা নেকী লাভ করে তা হলো প্রথম ধাক্কার সময়ের ধৈর্য। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “প্রকৃত ধৈর্য হলো প্রথম ধাক্বার সময়।”[হাদীসটি বুখারী (১২৩৮) ও মুসলিম (৯২৬) বর্ণনা করেন]

ইমাম নববী বলেন: হাদিসটির মর্ম হচ্ছে: পূর্ণ ধৈর্যের উপর বড় সওয়াব নির্ভর করে। যেহেতু পূর্ণ ধৈর্য ধরার কষ্ট বেশি।[সমাপ্ত]

ছ) বান্দা যদি বিপদের মোকাবেলায় সঠিক আচরণ করতে পারে তখন সেই বিপদ তার জন্য নিয়ামত হয়ে যায়। কারণ সেই বিপদের কারণে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করেন ও মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।

অনেক সময় বড় বিপদ দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ নিয়ামত দেন। আবার কিছু কিছু মানুষকে নিয়ামত দেয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করেন।

জ) মুসলমানের এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা উচিত যে, সম্পদ হারানো আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করার প্রমাণ নয়। স্বচ্ছলতা ও দারিদ্র্য উভয়টা পরীক্ষার মাধ্যম। আল্লাহ বলেন:

فَأَمَّا الإِنسَانُ إِذَا مَا ابْتَلاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَّمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ (15) وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ

মানুষের অবস্থা হলো: যখন তার রব তাকে পরীক্ষা করেন এবং সম্মান ও নেয়ামত দেন, তখন সে বলে: ‘আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন।’ আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে: আমার রব আমাকে লাঞ্ছিত করেছেন। কক্ষনো নয়”[সূরা ফজর: ১৫–১৬]

ঝ) একজন মুসলিমের উচিত বিপদের সময় আল্লাহর ঐ সকল নেক বান্দাদের অনুসরণ করা যারা ইতিপূর্বে পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আইয়ূব আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলেন: “এটা আমাদের পক্ষ থেকে রহমত” অর্থাৎ আমরা তার কষ্ট দূর করেছি এবং তার ওপর যে বিপদ ছিল তা সরিয়ে দিয়েছি, আমাদের দয়া ও অনুগ্রহে। "এবং ইবাদতকারীদের জন্য স্মরণিকা” অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার দেহে, সম্পদে বা সন্তান-সন্ততির ক্ষেত্রে পরীক্ষায় পড়ে তার জন্য নবী আইয়ূব আলাইহিস সালামের মধ্যে আদর্শ রয়েছে। কারণ আল্লাহ তাকে এর চেয়েও বড় পরীক্ষায় ফেলেছিলেন, কিন্তু তিনি ধৈর্য ধরেছিলেন ও সওয়াবের আশা করেছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেন।

ওয়ালীদ বিন আবদুল মালিকের কাছে একবার আবস গোত্রের এক অন্ধ বৃদ্ধ এলেন। এক সন্ধ্যায় তিনি যখন তার কাছে বসলেন তখন ওয়ালীদ তাকে তার খোঁজখবর জিজ্ঞেস করলেন?” লোকটি বলল: “হে আমিরুল মুমিনিন! এক রাতে আমি এমন অবস্থায় ঘুমালাম যে আবস গোত্রে আমার চেয়ে বেশি সম্পদ, ঘোড়া, উট, সন্তান এবং সম্মান ও প্রভাবশালী কেউ ছিল না। হঠাৎ এক বিধ্বংসী প্লাবন আমাদের ওপর আঘাত হানল। সেই স্রোত আমার পরিবার, সন্তান এবং ধন-সম্পদ সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমাদের কাফেলায় অবশিষ্ট রইল কেবল এক নবজাতক শিশু, আর একটি অবাধ্য উটের বাচ্চা। আমি শিশুটির দিকে এগিয়ে গেলাম এবং তাকে কোলে তুলে নিলাম। এরপর সেই অবাধ্য উটটির পিছু ছুটলাম যেটি দলছুট হয়ে গিয়েছিল। যখন আমি সেটিকে ধরতে পারছিলাম না, তখন শিশুটিকে মাটিতে নামিয়ে রেখে উটটির পেছনে দৌড়ালাম। হঠাৎ আমি শিশুটির চিৎকার শুনতে পেলাম; ফিরে এসে দেখি নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে। এরপর আমি পুনরায় উটটিকে ধরার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যখনই আমি সেটিকে কবজা করতে গেলাম, সেটি তার পা দিয়ে আমার মুখে প্রচণ্ড এক লাথি মারল। এতে আমার দৃষ্টিশক্তি চলে গেল এবং আমি চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। যখন আমার জ্ঞান ফিরল আমি ভাবলাম— সন্ধ্যায় আমি ছিলাম অঢেল সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং গোত্রের মধ্যে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী; অথচ সকাল হতে না হতেই আমি রিক্তহস্ত হয়ে গেলাম। আমার চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই। পাশে কোনো সন্তান বা পরিবার নেই, এমনকি কোনো সম্পদও অবশিষ্ট নেই। তবুও, এই পরিস্থিতির ওপর আমি আল্লাহর প্রশংসা করলাম (আলহামদুলিল্লাহ)।”

তখন ওয়ালীদ বললেন: “তাকে উরওয়া ইবনুল যুবাইরের কাছে নিয়ে যাও, যাতে সে জানে এই দুনিয়ায় এমন লোকও আছে, যে তার চেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে এবং আরও বেশি ধৈর্য ধরেছে।”

কবি বলেন:

"যদি কখনো বিপদে পড়ো, তবে ধৈর্য ধরো সম্ভ্রান্তের মতো। নিশ্চয় ধৈর্যশীলতা সর্বাধিক প্রজ্ঞাময়।

যদি কোনো সংকটে পড়ো, তবে নীরবতার পোশাক পরিধান করো (শান্ত থাকো)। নিশ্চয় এটাই সর্বাধিক নিরাপদ পথ।

কখনো সৃষ্টজীবের কাছে নিজের দুঃখের অভিযোগ করো না। এমনটি করলে অতি দয়ালু (আল্লাহ) সম্পর্কে এমন একজনের কাছে অভিযোগ করছো যে দয়া করতে জানে না।"

এমন কত বিপদ আছে যা বিপদগ্রস্তের জন্য নিয়ামত হয়ে যায়! কতক বান্দার জন্য দারিদ্র্য ও রোগই উত্তম। যদি সে সুস্থ ও ধনী হতো তবে অহংকারী ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে উঠত।

وَلَوْ بَسَطَ ٱللَّهُ ٱلرِّزْقَ لِعِبَادِهِۦ لَبَغَوْاْ فِى ٱلْأَرْضِ

“আল্লাহ যদি তাঁর বান্দাদের জন্য রিযিককে প্রশস্ত করে দিতেন, তাহলে তারা যমীনে সীমালঙ্ঘন করত।”[সূরা শূরা: ২৭]

কবি বলেন:

"তুমি দুঃশ্চিন্তাগুলোকে এড়িয়ে চলো; সবকিছুই তাকদিরের ওপর নির্ভরশীল।

নিকটবর্তী সময়ে কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো; যা তোমাকে অতীতের সব দুঃখ ভুলিয়ে দেবে।

হয়তো কোনো বিষয় তোমার কাছে এখন অপ্রীতিকর; কিন্তু পরিণামে সেটাই হবে তোমার কাছে সন্তুষ্টিকর।

কখনো পথ হয়ে ওঠে প্রণালীর মত সংকীর্ণ; আবার কখনো মহাশূন্যের মত প্রশস্ত।

আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন; সুতরাং তাঁর ফয়সালার সামনে প্রতিবাদী হয়ো না।

আল্লাহ তোমাকে অতীতে ভালো রেখে আসছেন; সুতরাং অতীতের ওপর ভিত্তি করে আগামীর প্রতি আশা রাখো।"

ঞ) বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর পতন মানে এই নয় যে ব্যক্তির কাছে তার অর্থের কিছুই ফিরে আসবে না। বরং হয়তো অর্ধেক বা তার চেয়ে বেশি বা তার চেয়ে কম ফিরে আসতে পারে। আর যদি সব অর্থই নষ্ট হয়ে যায় তবুও এটা দুনিয়ার সমাপ্তি নয় বা সব আশার অবসান নয়। বরং ভবিষ্যতে আল্লাহ তাকে নতুন সম্পদ দিতে পারেন এবং যদি সে ধৈর্য ধরে তাহলে আল্লাহ তাকে এর বিনিময় দিবেন।

৬- যে ব্যক্তি মিথ্যা তথ্য দিয়েছে, অন্যদেরকে অবাস্তব কিছু বুঝিয়েছে, প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি করেছে অথবা নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগের নামে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে তারপর পতনশীল বিনিয়োগ কোম্পানিতে করা ও লাভ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়ার কথা বলে ধোঁকা দিয়েছে, তাদের সবার ওপর আল্লাহর কাছে তওবা করা ওয়াজিব।

অনুরূপভাবে এমন ব্যক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত, যে মানুষের টাকা নিয়ে কিংবা তার বোন, মা বা স্ত্রীর সঞ্চিত অর্থ নিয়ে কী করতে যাচ্ছে তাদেরকে প্রকৃত অবস্থা না জানিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে নেমেছিল। এছাড়া এমন ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত, যে সুদের উপর ঋণ নিয়ে এসব বিনিয়োগ কোম্পানিতে ঢুকেছে। আশা করি কোম্পানিগুলোর প্রকৃত অবস্থা উন্মোচিত হওয়ার মধ্যে মহান শিক্ষা ও গভীর উপদেশ রয়েছে; এর থেকে শিক্ষা নেওয়া আবশ্যক।

৭- যারা উপদেশ দিয়েছেন এবং আগেই মানুষকে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে সতর্ক করেছিলেন, তাদের জানা উচিত যে, এমন অবস্থায় বিদ্রূপ বা উপহাসের কোনো সুযোগ নেই। বরং তাদের উচিত সব উপায়ে বিপদ লাঘব করা, দুঃখ দূর করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করা।

৮- ইসলামী দ্বীন এবং তার ওপর অবিচল সৎ লোকেরা কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি, বিশ্বাসঘাতকতা, অব্যবস্থাপনা বা বেপরোয়া বিনিয়োগের ফল বহন করবে না। বরং প্রত্যেক অপরাধী ও অবহেলাকারী নিজ নিজ কৃতকর্মের দায় নিজেই বহন করবে। অন্যের ওপর তার ভুল, মূর্খতা, মিথ্যা বা প্রতারণার দায় চাপানো বৈধ নয়।

আল্লাহ বলেন: “কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” আরও বলেন: “তোমরা যখন কথা বলবে, তখন ন্যায্য কথা বলবে।” আরও বলেন: “ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার নিকটতম।” আরও বলেন: “ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও।”

৯- ব্যবসায় লোকসান হলে হলে শরীয়তসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করা ওয়াজিব। অর্থাৎ লোকসানের পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে তা মূলধনের মালিকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। প্রত্যেককে তার মূলধনের অংশের অনুপাতে ভাগ দেওয়া হবে। অনাদায়ী ঋণ বা যে অর্থ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তা মূল অংকের চেয়ে কম মূল্যে ক্রয় করার মাধ্যমে দালালদের এই হারামি বা নিষিদ্ধ বাজার পরিচালনা করা বৈধ নয়। কারণ, এতে একই সাথে 'রিবাল ফাদল' (পরিমাণগত সুদ) এবং 'রিবাল নাসিয়া' (সময়গত বা বিলম্বিত সুদ)-এর সমন্বয় ঘটে। আর সুদ অন্যতম কবিরা গুনাহ।"

১০- মুসলমানদের উচিত পরস্পরের প্রতি সহনশীল হওয়া। গালি-গালাজ, ঝগড়া-বিবাদ, স্ত্রীকে তালাক দেওয়া, বাবা-মার অবাধ্য হওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বা অন্যের উপর আক্রমণ করার কোনো সুযোগ নেই।

সচ্ছল মুসলমানদের উচিত তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র, দুর্বল, এতিম, বিধবা, বৃদ্ধ এবং সীমিত আয়ের লোকদের সাহায্য করা; যারা নিজেদের ঘর, গাড়ি বিক্রি করে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে এই ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগে টাকা ঢেলেছিল। এবং যতটা সম্ভব সেই সব দান-খয়রাতের অর্থ উদ্ধার করা উচিত, যা অন্যায়ভাবে ও দাতাদের অনুমতি ছাড়া এসব বিনিয়োগে ঢোকানো হয়েছিল। কেননা সেইসব অর্থ-সম্পদের দাবিতে আওয়াজ তোলার মত লোক নেই।

মুসলিম আইনজীবীদের উচিত দুর্বলদের অধিকার আদায়ে সহায়তা করা, দানের অর্থগুলো উদ্ধারে সওয়াবের আশায় সেবা দেওয়া, নির্দোষদের নির্দোষ প্রমাণ করা এবং দ্বীনী কল্যাণকামনা সহকারে পরামর্শ দেওয়া।

আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, তিনি যেন বিপদগ্রস্তদেরকে উত্তম বদলা দেন, তাদের ক্ষতির পরিবর্তে এর থেকে উত্তম কিছু দান করেন এবং তাদেরকে ধৈর্য দান করেন। তিনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।

সূত্র

বিনিয়োগ

সূত্র

শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android