শরয়ি দলীলসমূহ প্রমাণ করে যে ছয় মাস বয়সী ভেড়া, এক বছর বয়সী ছাগল, দুই বছর বয়সী গরু ও পাঁচ বছর বয়সী উট কুরবানী করা জায়েয। এর চেয়ে কম বয়সী হলে হাদী কিংবা কুরবানী হিসেবে জায়েয হবে না।
কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে যে বয়স মেনে চলা ওয়াজিব
প্রশ্ন 41899
কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে কি কোনো নির্দিষ্ট বয়স আছে? দেড় বছর বয়সী গরু কুরবানী দেওয়া কি জায়েয?
উত্তরের সার-সংক্ষেপ
উত্তর
কুরবানীর পশুর বয়স মেনে চলা শরীয়তের নির্দেশ
আলেমরা একমত যে শরীয়ত কুরবানীর পশুর বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই এর চেয়ে কম বয়সী পশু কুরবানী করা জায়েয নেই। যে ব্যক্তি এর থেকে কম বয়সের পশু জবাই্ করবে তার কুরবানী হবে না। দেখুন: ইমাম নববীর ‘আল-মাজমূ’ (১/১৭৬)
এর সপক্ষে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে। যেমন:
- বুখারী (৫৫৫৬) ও মুসলিম (১৯৬১) এ সংকলিত বারা ইবনে আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন: আবু বুরদা নামে আমার এক মামা নামাযের আগে কুরবানী দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: “তোমার বকরী গোশত খাওয়ার বকরী হয়েছে (কুরবানীর বকরী হয়নি)।” তিনি বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে ছয় মাস বয়সী গৃহপালিত (জাযা‘আ) ছাগল আছে।’ অন্য বর্ণনায়: ‘আমার কাছে এক বছরের কম বয়সী (জাযা‘আ) ছাগী আছে।’ বুখারীর অপর এক বর্ণনায় আছে: ‘আমার কাছে ছয় মাস বয়সী (জাযা‘আ) এমন একটি ছাগল আছে যা দুটি এক বছর বয়সী ছাগীর চেয়ে উৎকৃষ্ট। আমি কি সেটি জবাই করব?’ তিনি বললেন: “সেটি জবাই করো। তবে তোমার পরে আর কারো জন্য এরূপ করা সঠিক হবে না।” অপর বর্ণনায় আছে: তোমার পরে কারো জন্য জায়েয হবে না। তারপর তিনি বললেন: “যে ব্যক্তি নামাযের আগে জবাই করল, সে নিজের জন্য জবাই করল। আর যে নামাযের পরে জবাই করল তার কুরবানী পরিপূর্ণ হল এবং সে মুসলিমদের রীতি অনুসরণ করল।”
উক্ত হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যে জাযা‘আ (ছয় মাস বয়সী) ছাগল কুরবানীর জন্য যথেষ্ট হবে না। হাদীসের جذعة শব্দের ব্যাখ্যা সামনে আসবে।
ইবনুল কাইয়্যিম ‘তাহযীবুস সুনান’ গ্রন্থে বলেন:
‘তোমার পরে আর কারো জন্য জায়েয হবে না'— এই কথাটি পরবর্তীতে কারো জন্য জায়েয না হওয়ার বিষয়টিকে অকাট্যভাবে সাব্যস্ত করে।’[সমাপ্ত]
- মুসলিমে (১৯৬৩) বর্ণিত হাদীস, জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা ‘মুসিন্নাহ’ (পূর্ণবয়সী) হওয়া ছাড়া কোন পশু জবাই করবে না। যদি তোমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায় তাহলে জাযা‘আ (ছয় মাস বয়সী) ভেড়া জবাই করতে পারো।”
উক্ত হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে অবশ্যই মুসিন্নাহ পশু জবাই করতে হবে। কেবল ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযা‘আ যথেষ্ট হবে।
ইমাম নববী শরহে মুসলিম গ্রন্থে বলেন: ‘আলেমরা বলেন: পশুর ক্ষেত্রে মুসিন্নাহ হচ্ছে উট, গরু ও ছাগল সবগুলোর ক্ষেত্রে 'সানিয়্যা'। এটি সুস্পষ্ট বক্তব্য যে কোনো অবস্থাতেই জাযা‘আ পশু জবাই করা জায়েয নেই; একমাত্র ভেড়ার ক্ষেত্রে ছাড়া।”
হাফেয ইবনে হাজার ‘আত-তালখীস’ (৪/২৮৫) গ্রন্থে বলেন: ‘হাদীসটির বাহ্যিক মর্ম দাবি করে যে, কেবল মুসিন্নাহ জবাই করতে সক্ষম না হলেই জাযা‘আ (ছয় মাস বয়সী) ভেড়া জবাই করা জায়েয হবে। কিন্তু মুসলিমদের ইজমা এর বিপরীত। সুতরাং এই হাদীসকে উত্তম অর্থে ব্যাখ্যা করতে হবে। হাদীসের মর্মের উহ্যরূপ হবে এমন: মুস্তাহাব হলো: 'মুসিন্না' ছাড়া জবাই না করা।’[সমাপ্ত] ইমাম নববীও শরহে মুসলিম গ্রন্থে অনুরূপ বলেছেন।
আউনুল মা’বূদ প্রণেতা বলেন: ‘এই ব্যাখ্যা করা অনিবার্য।’[সমাপ্ত]
তারপর তিনি বেশ কিছু হাদীস উল্লেখ করেন যেগুলো কুরবানীর ক্ষেত্রে জাযা‘আ ভেড়া জবাই করা জায়েয হওয়ার পক্ষে দলীল দেয়। এর মধ্যে রয়েছে: উক্ববা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জাযা‘আ ভেড়া জবাই করেছি।”[হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (৪৩৮২) বর্ণনা করেন। হাফেয বলেছেন: এর সনদ শক্তিশালী। শাইখ আলবানী সহীহুন নাসাঈতে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]
আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ (৫/৮৩)-তে কুরবানীর পশুর শর্তাবলির মধ্যে এসেছে:
‘দ্বিতীয় শর্ত: কুরবানী করার বয়সী হতে হবে। তথা উট, গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে সানিয়্যা এর বেশি বয়সী হওয়া। ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযা‘আ বা এর চেয়ে বেশি বয়সী হওয়া। ভেড়া ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ক্ষেত্রে সানিয়্যার চেয়ে কম বয়সী কুরবানী করা যথেষ্ট হবে না। একইভাবে ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযা‘আর চেয়ে কম বয়সী পশু কুরাবনী করা যথেষ্ট হবে না। ... এই শর্তের ব্যাপারে ফকীহরা সকলে একমত। কিন্তু তারা ثنية ও جذعة শব্দ দুটির ব্যাখ্যায় মতভেদ করেছেন।’[সমাপ্ত]
ইবনে আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ জানা নেই যে, ভেড়া ছাড়া ছাগলসহ অন্যান্য পশুর ক্ষেত্রে জাযা‘আর কম বয়সী কুরবানী করা জায়েয নেই। বরং এই সমস্ত পশুর ক্ষেত্রে সানিয়্যা বা এর চেয়ে বেশি বয়সী পশু কুরবানী করা জায়েয। ভেড়ার ক্ষেত্রে সুন্নাহ অনুযায়ী জাযা‘আ কুরবানী করা জায়েয।”[তারতীবুত তামহীদ (১০/২৬৭) থেকে সমাপ্ত]
ইমাম নববী (৮/৩৬৬) বর্ণনা করেন: ‘এই উম্মাহর ইজমা (ঐক্যমত্য) সংঘটিত হয়েছে যে, উট, গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে সানিয়্য-এর চেয়ে কম বয়সী পশু কুরবানী করা জায়েয নেই। আর ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযা‘-এর কম বয়সী হলে জায়েয নেই। তবে আমাদের মাযহাবের কিছু আলেম বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে উমর ও যুহরী বলেছেন: ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযা‘ জবাই করা জায়েয হবে না এবং ‘আত্বা ও আওযা’ঈ থেকে বর্ণনা করেছেন যে: উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া সবগুলোর ক্ষেত্রেই জাযা‘আ হলে কুরবানী করা জায়েয।’
পশুর বয়সের ব্যাপারে আলেমদের বক্তব্য:
পশুর শর্তকৃত বয়স নির্দিষ্ট করার ব্যাপারে ইমামরা মতভেদ করেছেন:
- হানাফী ও হাম্বলীদের মতে, ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযা‘ হচ্ছে এমন পশু যার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে মালেকী ও শাফেয়ীদের মতে জাযা‘ হচ্ছে এমন পশু যার এক বছর পূর্ণ হয়েছে।
- হানাফী, মালেকী ও হাম্বলীদের মতে ছাগলের ক্ষেত্রে ‘মুসিন্নাহ’ বা 'সানিয়্যা' হচ্ছে যার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে শাফেয়ীদের মতে, ছাগলের ক্ষেত্রে ‘মুসিন্নাহ’ হচ্ছে যার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে।
- হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে গরুর ক্ষেত্রে ‘মুসিন্নাহ’ হচ্ছে যার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে মালেকীদের মতে, 'মুসিন্নাহ' হচ্ছে যার তিন বছর পূর্ণ হয়েছে।
- হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে উটের ক্ষেত্রে ‘মুসিন্নাহ’ হচ্ছে এমন উট যার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে।
দেখুন: বাদায়েউ সানায়ি‘ (৫/৭০), আল-বাহরুর-রায়েক (৮/২০২), আত-তাজ ওয়াল-ইকলীল (৪/৩৬৩), শারহু মুখতাসার খলীল (৩/৩৪), আল-মাজমূ (৮/৩৬৫), আল-মুগনী (১৩/৩৬৮)।
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ ‘আহকামুল উদহিয়া’ গ্রন্থে বলেন:
‘উটের ক্ষেত্রে সানিয়্য হচ্ছে যার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। গরুর ক্ষেত্রে সানিয়্য হচ্ছে যার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। ছাগল-ভেড়ার ক্ষেত্রে সানিয়্য হচ্ছে যার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। আর জাযা‘ হচ্ছে যার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। সুতরাং উট, গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে সানিয়্য-এর চেয়ে কম বয়সী হলে কুরবানী দেওয়া যাবে না। আর ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযা‘ এর চেয়ে কম বয়সী হলে কুরবানী দেওয়া যাবে না।’[সমাপ্ত]
ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (১১/৩৭৭)-তে এসেছে: ‘শরয়ি দলীলসমূহ প্রমাণ করে যে ভেড়ার ক্ষেত্রে ছয় মাস, ছাগলের ক্ষেত্রে এক বছর, গরুর ক্ষেত্রে দুই বছর ও উটের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পূর্ণ হলে তা দিয়ে কুরবানী করা যথেষ্ট হবে। এর চেয়ে কম হলে তা হাদী কিংবা কুরবানী কোনোটির জন্যই যথেষ্ট না। (২: ১৯৬ আয়াতে) যে হাদী প্রাপ্তি সহজ হবে দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য; কেননা কুরআন ও সুন্নাহর দলীলসমূহ একটি অন্যটিকে ব্যাখ্যা করে।’[সমাপ্ত]
কাসানী ‘বাদায়িউস সানায়ি’ (৫/৭০) গ্রন্থে বলেছেন:
‘এই বয়সগুলো এভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে বয়সের কমতি ঠেকানোর জন্য; বয়স বেশি হলে সেটি থামানোর জন্য নয়। তাই কেউ যদি এর চেয়ে কম বয়সী কোনো পশু কুরবানী দেয় তাহলে সেটি জায়েয হবে না। যদি এর চেয়ে বেশি বয়সী পশু কুরবানী দেয় তাহলে সেটি জায়েয হবে ও উত্তম হবে। কুরবানীর ক্ষেত্রে 'হামাল' (ভেড়ার বাছুর), জাদি (ছাগলের বাছুর), ঈজল (গরুর বাছুর) ও ফাসীল (উটের বাছুর) কুরবানী দেওয়া জায়েয নেই। কারণ শরীয়তের দলিলে আমাদের উল্লিখিত শব্দাবলীতে পশুর বয়স বর্ণিত হয়েছে। আর পূর্বোক্ত নামের পশুগুলোকে সেই সব শব্দে নামকরণ করা হয় না।’[সমাপ্ত]
সুতরাং পূর্বোক্ত আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, দুই বছরের কম বয়সী গরু কুরবানী করা কোনো ইমামের মতেই জায়েয হবে না।
আরো জানতে (106597) ও (36432) নং প্রশ্নের উত্তর দেখুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সূত্র:
ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব